ব্যারিস্টার ফুয়াদ, আমরা আপনার আলোচনার জবাব দিয়েছি - পর্ব ১
ব্যারিস্টার ফুয়াদ, আমরা আপনার আলোচনার জবাব দিয়েছি - পর্ব ১
-
ব্যারিস্টার ফুয়াদ সাহেব সাম্প্রতিক সময়ে যে দুটি ভিডিও পোস্ট করেছেন, তার সম্মিলিত দৈর্ঘ্য ২০ মিনিটেরও কম এবং মোট শব্দ সংখ্যা আনুমানিক ২০০০-এর কাছাকাছি। কিন্তু এই সামান্য ২০০০ শব্দের ভেতর তিনি - জিওপলিটিক্স, জিহাদ, শরিয়াহ, উসুল, ফিকাহ, ইসলামী রাষ্ট্রের সংজ্ঞায়ন, ফিলিস্তিন, হামাস, আরাকান সংকট, খারেজি এবং তাকফিরসহ প্রায় ২৫টিরও বেশি অতি-জটিল রাজনৈতিক ও ধর্মতাত্ত্বিক ইস্যু উল্লেখ করেছেন। যেকোনো সাধারণ দর্শক প্রথমবার শুনলে তার এই তথ্যের মহাসমুদ্রে ভেসে যেতে পারেন এবং মনে করতে পারেন - বক্তা বোধহয় এক অগাধ পণ্ডিত! কিন্তু আমরা যখন যুক্তিবিদ্যা (Logic), জ্ঞানতত্ত্ব (Epistemology), মনস্তত্ত্ব (Psychology) এবং একাডেমিক মেথডোলজির ফিল্টার দিয়ে তার এই বক্তব্য ব্যবচ্ছেদ করি, তখন তার এই আপাত-পাণ্ডিত্যপূর্ণ উপস্থাপনার আড়ালে অনেক অসঙ্গতি প্রকাশ হয়ে যায়।
.
ব্যারিস্টার ফুয়াদের মূল আলোচনার ব্যবচ্ছেদ আমরা করব ইনশা আল্লাহ তবে এর আগে আমাদের কিছু মৌলিক বিষয় জেনে নেয়া খুব প্রয়োজন।
১. যুক্তিবিদ্যার মানদণ্ডে ‘গিশ গ্যালপ’ এবং ক্যাটাগরি এররের ছড়াছড়ি ব্যারিস্টার ফুয়াদের পুরো উপস্থাপনটিতে বেশ কিছু তাত্বিক দুর্বলতা এবং প্রবলেম আছে। আমরা কয়েকটি উল্লেখ করছি -
ক) দ্য গিশ গ্যালপ (The Gish Gallop)এটি বিতর্কের এমন এক কুখ্যাত ও অনৈতিক কৌশল, যেখানে বক্তা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে শ্রোতাদের সামনে একের পর এক অসংখ্য দাবি, তথ্য, আধা-সত্য এবং জটিল বিষয়ের অবতারণা করতে থাকেন। উদ্দেশ্য একটাই - শ্রোতাকে তথ্যের চাপে পিষ্ট (Overwhelm) করা। ২০ মিনিটের ভিডিওতে ২৫টি অতি-সংবেদনশীল বিষয়ের অবতারণা করে ফুয়াদ সাহেব মূলত এটিই নিশ্চিত করেছেন যেন শ্রোতা কোনো একটি নির্দিষ্ট পয়েন্টে দাঁড়িয়ে চিন্তা করার বা ফ্যাক্ট-চেক করার সময় না পান। একাডেমিক আলোচনায় যেখানে একটিমাত্র শব্দ (যেমন: ‘জিহাদ’ বা ‘ইসলামী রাষ্ট্র’) ডিফাইন করতেই শত পৃষ্ঠার গবেষণার প্রয়োজন হয়, সেখানে তিনি কোনো সংজ্ঞা না দিয়েই ঝড়ের গতিতে সিদ্ধান্ত দিয়ে গেছেন।
.
খ) ক্যাটাগরি এরর বা শ্রেণিগত বিভ্রম (Category Error) - ফুয়াদ সাহেব তার আলোচনায় আফগানিস্তানের ‘তালেবান’, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘টিটিপি’, বৈশ্বিক সালাফি-জিহাদি নেটওয়ার্ক ‘আল-কায়েদা’ কিংবা উগ্রপন্থী ‘আইসিস’ ও ‘বোকো হারাম’ - সবগুলোকে একই ফ্রেমে নিয়ে এসেছেন। এটি একটি মারাত্মক একাডেমিক অপরাধ। ভূ-রাজনীতি ও আদর্শ এবং পলিসিগত অবস্থান থেকে প্রতিটি গোষ্ঠীর আদর্শিক ভিত্তি, ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা এবং কৌশলগত লক্ষ্য সম্পূর্ণ আলাদা। এমনকি এ ব্যাপারে যারা বিশেষজ্ঞ তারাও এই শ্রেনী পার্থক্য কখনো এক করে দেননি।
.
২. জ্ঞানতাত্ত্বিক শূন্যতা (Epistemological Void) - জ্ঞানতত্ত্ব বা এপিস্টেমোলজির প্রধান শর্ত হলো - যেকোনো বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে তার মৌলিক চলক বা ভেরিয়েবলগুলোকে সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হবে। ফুয়াদ সাহেব এখানে সম্পূর্ণ জ্ঞানতাত্ত্বিক অসততার আশ্রয় নিয়েছেন যেমন -
সংজ্ঞায়ন এড়িয়ে যাওয়া (Avoiding Definitions or Definitional dodge): ফুয়াদ সাহেব দাবি করেছেন, কোনো মুসলিম রাষ্ট্রের ভেতরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা জিহাদ হতে পারে না। কিন্তু তিনি একবারও স্পষ্ট করেননি যে - একটি “মুসলিম রাষ্ট্র” বলতে শরিয়াহ’র দৃষ্টিতে আসলে কী বোঝায়? রাষ্ট্রের সংবিধান যদি সেক্যুলার বা মানবরচিত আইনের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে শরিয়াহর “উসুল” (মূলনীতি) অনুযায়ী সেই রাষ্ট্রের আইনি অবস্থান কী? তিনি “জিহাদ” শব্দটির ইসলামিক ও আইনি ডাইমেনশনগুলোকে কোনো প্রকার “উসুল” বা “ফিকাহ”-এর মানদণ্ডে ব্যাখ্যা না করেই নিজের একটি মনগড়া রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়েছেন। একাডেমিক দুনিয়ায় একে বলা হয় “মেথডোলজিক্যাল ভ্যাকিউম” (Methodological Vacuum) বা পদ্ধতিগত শূন্যতা, যেখানে গবেষণা আলোচনার কোনো তাত্ত্বিক ভিত্তি ছাড়াই সরাসরি মনগড়া ফলাফলে উপনীত হওয়া হয়।
.
৩. দ্বিচারিতা ও সিলেক্টিভ বায়াস (Double Standards & Selective Bias) - তিনি ভারতের মুসলিম নির্যাতন, কাশ্মীর সংকট বা আসামের উইঘুর-সদৃশ পরিস্থিতি নিয়ে টিটিপি বা উগ্রপন্থীরা কেন কথা বলে না - তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কিন্তু একই সমীকরণে তিনি পাকিস্তানের সামরিক এস্টাবলিশমেন্টের নিজেদের নাগরিকদের ওপর চালানো ভয়াবহ দমনপীড়ন ও মার্কিন ড্রোন হামলার লাইসেন্স দেওয়ার নির্মম ইতিহাস সযত্নে এড়িয়ে গেছেন। এটি তার চরম রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব (Political Bias) এবং একচোখা দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রমাণ করে।
এরকম আরো অনেক প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থান আমরা খুঁজে পেয়েছি তবে আলোচনা লম্বা হয়ে যাবার ভয়ে আমরা এই সেকশন আর লম্বা করতে চাচ্ছিনা বরং শুরু করা যাক মূল আলোচনা।
.
ব্যারিস্টার ফুয়াদ বলেছেন -
“বাংলাদেশে জিহাদ ব্যবসায়ী আছে বাংলাদেশে জঙ্গি ব্যবসায়ী আছে এটা একটা বিজনেস মাথায় রাখতে হবে এই বিজনেসের সাথে একটা গ্লোবাল ফেনোমেনা জড়িত এবং এই ব্যবসার সাথে আমাদের ধর্মকে ট্যাগ করে দিয়ে আমাদের কিছু আলেম ওলামায়ে কেরাম যারা উগ্র চিন্তায় বুদ্ধিতে খুবই স্থূল এই লোকগুলো কথাবার্তা বলার সময় তো জবানের কোন নিয়ন্ত্রণ নাই এগুলো বইলা টইলা এইটার একটা ন্যারেটিভ তৈরি করে এবং করে যেটা করতেছে ইসলাম ধর্মকে তো ছোট করে এই ধর্মীয় এই ধর্মটাকে যারা অনুসরণ করে তাকে প্রত্যেকদিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে।”
উত্তরঃ
ব্যারিস্টার ফুয়াদ, আপনি যখন বললেন - ‘আমাদের ধর্ম’ আপনার এই আমাদের বলতে কারা? তারা ধর্মকে কিভাবে বুঝে? আপনার মত সেকুলার ডেমোক্র্যাটিক লেন্সে? তারা কি আপনার মত র্যান্ড কর্পোরেশনের শিখিয়ে দেয়া ‘উগ্রবাদ’ সবকের কোচিং করে?
ফুয়াদ সাহেব, আপনি যখন বললেন - ‘আমাদের ধর্ম’ তখন আপনি টেকনিক্যালি যা করেছেন তা হচ্ছে নিজের মত, বিশ্বাসের গ্রহনযোগ্যতার সুপিরিওরিটি এবং অথরিটি তৈরি করতে চেয়েছেন। অনেকটা এমন - ব্যারিস্টার ফুয়াদ এবং তার অনুরূপ ধর্মের বুঝের উপরে যারা আছে তারাই সঠিক। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এটা ইসলাম ধর্ম। অন্য কোন ধর্ম হলে আপনি পার পেয়ে যেতেন, কিন্তু এটি ইসলাম ধর্ম এবং এর রেফারেন্স পয়েন্ট ব্লার হয়ে যাওয়া বা কনফিউজ হয়ে যাবার কোন সুযোগ নেই। আপনি ধর্ম দেখার যে লেন্স ব্যবহার করছেন ইসলামে তা বাতিল।
.
সম্ভবত আপনার বিশ্বাস এবং মূল রাজনৈতিক দর্শন দাঁড়িয়ে আছে উদারনৈতিক ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রের (Secular Liberal Democracy) ওপর। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাস সাক্ষী, গণতন্ত্রের জন্মই হয়েছে রাষ্ট্র পরিচালনা ব্যবস্থা থেকে ধর্মের কর্তৃত্বকে সম্পূর্ণ উচ্ছেদ বা পৃথক করার মাধ্যমে (Separation of Church and State)। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী কোনো ব্যক্তি ইসলামের মতো একটি জীবনব্যবস্থার কোনো বিষয়ে কথা বলার নৈতিক বা জ্ঞানতাত্ত্বিক অধিকার বা Sultah Ma’rifiyyah (Epistemic Authority) রাখেন না।
আপনি ‘জঙ্গি ব্যবসা’ টার্ম উল্লেখ করে এক শ্রেণীর আলেমের ঘাড়ে দায় চাপিয়েছেন তারা ধর্মকে ট্যাগ দিয়ে ন্যারেটিভ তৈরি করে। আপনার পুরো দাবীটি অত্যন্ত স্থূল এবং ওজনে হালকা, কারণ আপনি এখানে ‘জঙ্গি’ ধারণা দ্বারা যা বুঝাতে চেয়েছেন তা হচ্ছে পশ্চিমের তৈরি করে দেয়া ‘জঙ্গি মডেল’। বাংলাদেশে বিগত দশকগুলোতে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সরকারগুলো কীভাবে পশ্চিমা ও আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর স্বার্থে “জঙ্গি ব্যবসা” বা “Radical Islam”-এর ন্যারেটিভ উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণ করেছিল, তা আজ প্রমাণিত এবং অ্যাকাডেমিকভাবে ডকুমেন্টেড। আপনি আজও ঠিক অই জঙ্গি মডেলটি সামনে রেখে আপনার বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্ব প্রমান করে চলেছেন।
ব্যারিস্টার ফুয়াদ, আপনার কাছে আমাদের সরাসরি প্রশ্ন:
আপনার আদর্শিক ভিত্তি যেখানে সেকুলার ডেমোক্রেসি, যা ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে আলাদা করে - সেখানে আপনি কোন যোগ্যতায় ইসলাম ধর্মের মহাজন সেজে ‘আমাদের ধর্ম’ ন্যারেটিভ তৈরি করছেন? কোন উত্তর আছে কি?
.
চলবে ইনশা আল্লাহ …


