মিথ্যা যখন বলে “আমিই সত্য” তখন আপনি কি করবেন?
মিথ্যা যখন বলে “আমিই সত্য” তখন আপনি কি করবেন?~
.
আপনি অনেক শুনেছেন নিশ্চয়ই - আমেরিকা বলছে “আমরা শান্তির দূত”, ইসরাইল দাবি করছে, “We are the most moral army in the world”। কলিন পাওয়েল ২০০৩ সালে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিল ইরাকে WMD আছে - যা পরে ইতিহাসের অন্যতম state sponsored lie হিসেবে প্রমাণিত হয়েছিল। কিংবা এও স্মরণ করুন যখন হাসিনার মন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেছিল - ‘গুম বলে কিছু নাই’। আচ্ছা বলুনতো যখন রাষ্ট্র যখন এরকম মিথ্যার উপর দাঁড়িয়ে আমাদের শাসন করে তখন আপনি কী করতে পারেন? তথ্য দিয়ে খণ্ডন? প্রমাণ সাজানো? Counter narrative-এর চেষ্টা?
ভুল, এটা হচ্ছে একটা ডেলিবারেট ফাঁদ।
.
When power lies - thats not a mistake, thats a ‘Mechanism’
ক্ষমতার মিথ্যা কোনো নৈতিক পতনের ঘটনা নয় বা কোন ভুল নয়, এটা একটা deliberate mechanism. Hannah Arendt তার বিখ্যাত রচনায় লিখেছে -
“The deliberate denial of factual truth, the ability to lie and the capacity to change facts, the ability to act - are interconnected; they owe their existence to the same source: imagination.”[১]
অর্থাৎ, মিথ্যা এবং ক্ষমতা একই উৎস থেকে জন্মায়। এটা কোনো আকস্মিক পথভ্রষ্টতা নয়, এটা রাষ্ট্রের সক্রিয় হাতিয়ার। এই হাতিয়ার কীভাবে কাজ করে? নোয়াম চমস্কি এবং এডওয়ার্ড হারম্যান তাদের যুগান্তকারী গ্রন্থ Manufacturing Consent-এ দেখিয়েছে:
“The mass media serve as a system for communicating messages and symbols to the general populace. It is their function to amuse, entertain, and inform, and to inculcate individuals with the values, beliefs, and codes of behaviour that will integrate them into the institutional structures of the larger society.” [২]
মিডিয়া, রাষ্ট্র এবং কর্পোরেট স্বার্থ - এই ত্রিভুজ মিলে একটা প্রোপাগান্ডা মেশিন তৈরি করে। এই মেশিনের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গেলে আপনাকে ‘fringe’ বলা হয়, radical কিংবা ‘terrorist’ বলা হয়। এটা শুধু তত্ত্ব নয়, এটাই আমাদের চোখের সামনে প্রতিদিন ঘটছে।
.
Counter Narrative: The trap you don’t recognize!
Counter Narrative একটা সীমা পর্যন্ত প্রোডাকটিভ, এবং শর্ত সাপেক্ষে। Counter Narrative অবশ্যই তা কাজে আসে তবে এখানে একটা অদৃশ্য বাফার যোন আছে যা অনেকেই বুঝতে পারেননা। বাস্তবতা হচ্ছে - even the counter narrative has it’s own limitations. একটা মিথ্যা ডিবাঙ্ক করতে ,করতে গেলে আরও একশোটা মিথ্যা সামনে চলে আসে। এটা কি কাকতালীয়? না। Jacques Ellul তার প্রোপাগান্ডা গ্রন্থে এই কৌশলটাকেই ব্যাখ্যা করেছিল:
“The propagandist naturally cannot reveal the true intentions of the principal for whom he acts... That would be to submit the principal to public judgment.” [৩]
যারা প্রোপাগান্ডা ছড়ায় - তারা কখনো প্রকৃত উদ্দেশ্য প্রকাশ করে না, শুধু মিথ্যার স্তর বাড়াতে থাকে। আর আমরা? একটার পর একটা মিথ্যার পেছনে দৌড়াই, এক্সপোজ করতে করতে নিজেদের শক্তি, সময় এবং মনোযোগ খরচ করি তাদেরই তৈরি করা টার্ফে, আমরা মনে করি আমরা তাদের হারিয়ে দিচ্ছি কিন্তু বুঝতেই পারিনা আমরা আসলে তাদের টার্ফে খেলছি!
এই প্রসেস এর গভীরতা Michel Foucault বুঝিয়েছিল তার power/knowledge তত্ত্বে - যেখানে সত্যকে ডিফাইন করার ক্ষমতা যার কাছে, শাসনের ক্ষমতা তারই। [৪] বা উল্টো করে বললে ক্ষমতা যার কাছে সেই সত্যকে ডিফাইন করে।
এরপরেও থাকে শক্তির ভারসাম্যের অভাব। মনে করুন আপনি ‘দা বেস্ট’ কাউন্টার ন্যারেটিভ নিয়ে আসলেন কিন্তু সেটি উপস্থাপন করার জন্য আপনার কাছে কোন মাইক নেই, কোন স্টেজ নেই, কোন পোডিয়াম নেই। আপনি কথা বলতে গেলে আপনার অ্যাকাউন্ট রেস্ট্রিক্ট করে দেয়া হয়, আপনি সেমিনার করতে গেলে আপনাকে হুমকি দেয়া হয়, আপনি হঠাত বুঝতে পারেন - you need power, not policy.
.
লক্ষ্য করুন, আপনি কি কারো তৈরি করা বিচার মঞ্চে নিজের নির্দোষতা প্রমাণ করতে পারবেন - যেখানে বিচারক, জুরি, সাক্ষী এমনকি আইনের ভাষাটাও তাদের? এটা কোন বিতর্ক নয় বা সুপারফিশিয়াল কোন অ্যানালোজি ও নয় এটাই রিয়্যালিটি।
এই সিস্টেমটি বলে - তুমি কথা বল, তোমার সমস্ত মেধা শক্তি শেষ কর, আমরা অপেক্ষা করছি। কিংবা তুমি কথা বল আমরা তোমার বিপক্ষে আরো ১০০ জনকে দাড় করিয়ে দিচ্ছি লড়তে থাকো দেখা যাক তুমি কতখন টিকে থাকতে পারো! এই লড়াই আরো কঠিন হয়ে যায় যখন আপনি বুঝে যান এখনো এমনকি এই সিস্টেমের বাইরে থাকা দর্শক সমাজ আপনার ন্যারেটিভ গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত না, এবং এটি ক্ষমতাশীলরাও জানে।
দুঃখজনক সত্য হলো - এই প্রক্রিয়ার কোনো টেক্সটবুক স্বীকৃত নাম নেই বললেই চলে। Propaganda studies, political communication বা critical theory কোর্সে এই systematic lie-flooding- এর আলাদা কোন আলোচনা আছে কিনা আমাদের জানা নেই, অথচ এটাই আজকের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক অস্ত্র। One fine morning - a big fat lie can be the policy or legal binding for you and you just can not do anything about it!
.
What should we do then?
তাহলে আমরা কি হাল ছেড়ে দিব? মাঠ ছেড়ে পালিয়ে যাবো? মোটেও নয়। মাঠ ছেড়ে পালানো নয় বরং - নিজের মাঠ নির্মাণ করা। ডিফেন্স মোড থেকে বেরিয়ে আসুন। নিজের আদর্শিক বিশ্বাসের শিকড় খুঁজে বের করুন আর সেখানেই ফিরে যান। নিজেকে এবং পরিবারকে সুরক্ষিত করুন, আমাদের বিশুদ্ধ আদর্শ বিশ্বাস এবং তাওহিদের ভিত্তির উপরে। ন্যায়, ইনসাফ এবং পাপ পূণ্যের মুল্যবোধের উপরে। তাদেরকে সেই সংজ্ঞা শিক্ষা দিন যা আমাদের দ্বীন শিক্ষা দেয়, সেই সংজ্ঞা নয় যা তাদের মেকানিজম শিক্ষা দেয়।
.
আপনার পরিবার আপনার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসুন, পরিবারকে তাদের তৈরি ন্যারেটিভের হাতে ছেড়ে দিবেন না। সন্তানকে বিশুদ্ধ বিশ্বাস ও মূল্যবোধের উপর গড়ে তুলুন, তাদের সিস্টেমের অফার করা, প্রেসক্রাইব করা বিশ্বাস এবং মূল্যবোধের উপর নয়। আপনি, আপনার পরিবার, আপনার বন্ধু এবং সম্ভাব্য চারপাশের মানুষ নিয়ে একটা সক্রিয় ইন্টেলেকচুয়াল এবং কালচারাল স্পেস দখল করুন। চ্যালেঞ্জ করুন। ভুল শুনেন নি, চ্যালেঞ্জ করুন, কারণ আজকের দুনিয়ায় সেই টিকে থাকবে যে টিকে থাকার অধিক যোগ্য, নিজের স্থান তৈরি করে নিন।
Herbert Marcuse সতর্ক করেছিল - “The administered world... represses every genuine alternative.” [৫]
.
মনে রাখবেন - তারা চায় আপনি বিকল্প না দেখুন, না ভাবুন। তারা চায় আপনি তাদের খেলার মাঠেই থাকুন - রেফারি তাদের, নিয়মও তাদের, গোলপোস্টও তারাই সরায়।
.
Last but not the least
মিথ্যার বিরুদ্ধে সব সময়ে খণ্ডন দিয়ে লড়া যায় না, বিশেষ করে যখন সত্য এবং মিথ্যার সীমারেখাই নষ্ট করে দেয়া হয়, যখন মিথ্যা নিজেই বলে “আমি মিথ্যা নই”। কিন্তু যে মানুষ নিজে সত্যের উপর শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, নিজের পরিবার নিয়ে, নিজের শক্তি নিয়ে নিজের আপন পরিমণ্ডল নিয়ে, নিজের আদর্শ নিয়ে, নিজের বিশ্বাস নিয়ে, নিজের পায়ের নিচের মাটির উপরে দখল নিয়ে - তার সামনে এই মিথ্যা যন্ত্র অসহায়, আজ না হয় কাল, ইনশা আল্লাহ।
কারণ একটা মিথ্যা সবচেয়ে বেশি ভয় পায় এমন মানুষকে - যে তার সাথে এনগেইজ ‘ই করে না, বরং নিজের বিশ্ব নিজেই গড়ে নেয়া শুরু করে।
যে মিথ্যার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলেনা তুমি মিথ্যা বরং সে ভরাট আত্মবিশ্বাসের সাথে মিথ্যার সামনে বলে আমি সত্য।
লক্ষ্য করুন আল্লাহ কত সুন্দর করে এ বিষয়টির ব্যাপারে আমাদের উৎসাহ দিয়েছেন -
بَلْ نَقْذِفُ بِٱلْحَقِّ عَلَى ٱلْبَـٰطِلِ فَيَدْمَغُهُۥ فَإِذَا هُوَ زَاهِقٌۚ
কিন্তু আমি সত্য দ্বারা আঘাত হানি মিথ্যার উপর; ফলে ওটা মিথ্যাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয় এবং তৎক্ষণাৎ মিথ্যা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। [আল আম্বিয়া - ১৮]
আমরা কি তেমন মানুষ হওয়ার কথা ভেবেছি কখনো?


